মনের ময়না তদন্ত
‘কারো মনের খবর কেউ জানবে না,’ -এটা নিশ্চিত ॥
নিজের মনটাকেই জানি না ঠিকমতো,-
অথচ!-অন্যকে চিনেছি ব’লে বড়াই করি।
‘চাওয়া আর চেষ্টা’-তেই ক্রিয়া সীমাবদ্ধ,-ফলাফল অজানা,
-তবুও স্বভাবগতভাবে সেই ‘চাওয়া এবং চেষ্টা’-কে
সক্রিয় ক্রিয়া ভেবে ভেবে বার বার ভুল করি ॥
‘আমি নিষ্ক্রিয় ক্রিয়ায় লিপ্ত,’-এমন একটি সত্য জানা মাত্রই
এই ক্ষুদ্র আমি হ’য়ে যাই অস্থির,-
গোপনে খুঁজতে থাকি নিজের অস্তিত্ব ॥
[একটি গোপনীয় তথ্য ]
(‘আমাকে চাওয়ানো হয় এবং চেষ্টিত রাখা হয়,’-
-ভাববাচ্যে এভাবে না-ভেবে,-যখন কর্তৃ বা কর্ম বাচ্যে ভাবি,
অর্থাৎ, -‘সৃষ্ট মহাজগতের’কোনো ব্যক্তি বা বস্তু (দৃশ্য বা অদৃশ্য)-কে
কর্তা সাজিয়ে ভাবি, যেমন,--‘আমি চাই এবং চেষ্টা করি,’-
অথবা যখন,-‘ঘটনাটা ওভাবেই ঘটবার ছিলো,’-এভাবে না-ভেবে,-
-যদি,--‘ঘটনাটা ওভাবে ঘটানো হ’লো,’-এভাবে ভাবতে চাই,
তাহলে আমার ধারণা বা আন্দাজের সাথে যেগুলো মেলে না ফলাফলে,
--সেগুলো অস্থির হতাশা নিয়ে আসে এবং ক্লান্ত প্রশান্ত মনটাকে
অশান্ত ক’রে তোলে।)
কেউ যখন প্রায় চূড়ান্তভাবে বুঝতে পারে,-
-নিজে নিজে বুঝতে পারে যে,-
সে যা’ চাচ্ছিলো, -তা’ চাওয়া কতখানি বাস্তবসম্মত ছিলো,
অথবা, --সে-ই ‘চাওয়া’-টা
আদৌ ‘যুক্তিসঙ্গত চাওয়া’ ছিলো কি-না,--
যে ভাবেই বুঝুক, -বুঝলেই,--
-তখনি সেখানে সে আত্মসচেতন হ’য়ে যায়
এবং তখনি, -নিমেষে তার প্রসারিত সচেতন মুক্ত মন
ছড়িয়ে যায় মহাবিশ্বময়, -সবখানে ;
এবং প্রতিধ্বনিত হ’তে থাকে,--
--প্রতিবিম্বিত হ’তে থাকে
সৃষ্ট এ মহাজগতের দৃশ্য-অদৃশ্য
প্রতিটি উপাদানে, প্রতিটি উপকরণে,-
--প্রত্যেক মুক্ত স্বতন্ত্র মানুষের মনে ॥
আমার মালিকানায় অস্থির কী-নেই, কী-আছে,-
-তাতে কী’বা এসে যায়।
তবে,‘স্থির প্রতিজ্ঞা’ আছে, -মুক্তমনা হ’তে চাই,--
-তা’ যেন সফলতা পায় ॥
তৃপ্ত হবার যোগ্যতা চাই, -ঠিক তাদেরই মতো,
-যারা মুক্তমনা, সৎসাহসী,
সদানন্দিত, আত্মসম্মানিত ;
-যারা কারো নোংরামো নিয়ে করে না ঘাঁটাঘাঁটি,-
--অন্যকে করে না অপমানিত ;
--অন্যের ভালো দিকগুলো নিয়েই
তাদের আলোচনা অনুশীলন ;
-অপরের দোষ ঢেকে রেখে
সযত্নে করে তাকে লালন পালন ;
--দোষগুলোকে ছকে বেঁধে বন্দি ক’রে নিয়ে
সুন্দরের কাজে ক্রীতদাস বানানোতে,
-অর্থাৎ, সার্বজনীন মঙ্গলের কাজে
খাটানোর কৌশলে, -দেখা যায়,
-মুক্তমনারাই সার্থক সফল।
কারো আড়ালে তার দোষ নিয়ে কানাকানি এড়িয়ে চলার
অথবা পরদোষচর্চাকারীদেরকে বাধা দেওয়ার সতর্ক ভঙ্গিতে
যেকোনো মুক্তমনাকে দেখে
আমার সমজীবী সাধারণ চোখে মনে হ’তে থাকে,
-তারা হয়তো বা ভীতু অথবা দুর্বল ;
অথবা, -সমকালের প্রেক্ষিতে সীমাবদ্ধ শিক্ষণে
মনে হ’তে পারে, -মুক্তমনারা ব্যর্থ বিফল ॥
দেখা যায়, --মুক্তমনার মুখ আর হাত থেকে অন্যেরা নিরাপদ ॥
অতিচালাকের লাগাম অথবা গলার দড়ি ধ’রে রাখবার
দায়িত্বপ্রাপ্ত ঐ মুক্তমনারাই, --যারা স্বয়ং সুরক্ষিত ;
--অনুসরণযোগ্য মুক্তমনারা আত্মনিয়ন্ত্রিত,-
এবং তারা ভারসাম্যহীন নয় ;
--অথবা, -ঘুরিয়ে বলা যায়,---
ধৈর্যহীন ভারসাম্যহীন আত্ম-অ-নিয়ন্ত্রিত
হুজুগে-তাড়িতরা কখনোই
কোনো প্রতিজ্ঞাকারীর অনুসরণযোগ্য নয় ॥
নিজেকে নীল-রক্ত-ধারী আভিজাত্যধারী নরাধম
মনে ক’রে ফুলে ফেঁপে মজা পাই যারা
কেবল বাহারি পোশাক দেখিয়ে
নিতে চাই সত্যের ইজারা ;
-মঞ্জুরিহীন অবৈধ ব্যবসা ধরা প’ড়ে যায়,
-ডুবে যাই আমি সর্বনাশা হতাশায় ॥
আমি আত্মপ্রতারিত,--
-নিজেকে অন্যের চে’ বেশি চতুর মনে করার মতোই
আমি আত্মপ্রতারিত, --তবুও দেখলাম!
--দেখলাম, -মুক্তমনাকে নাগালে পাওয়া কঠিন কিছুই নয় ;
-হ’তে চাই মুক্তমনা, -স্থির ব্যক্তিগত এই প্রতিজ্ঞাটুকু
এবং ‘একটা সংকীর্ণ তুচ্ছ মন’ ছাড়া কিছুই নেই আমার দখলে।
--যদিও আমি নগণ্য, ঐ প্রতিজ্ঞাটুকুই যথেষ্ট হ’লো
মুক্তমনাকে নাগালে পাবার জন্য।
--ক্ষুদ্রমনা আমাকে যখন দেখতে চাওয়ানো হ’লো
আনমনে আপনমনে,-
--সাধারণের মধ্য থেকেই মুক্তমনা
প্রদর্শিত হ’লো দিব্যদর্শনে ॥
-কুয়াশার ভেতর দিয়ে যতদূর দৃষ্টি যায় তার বেশি নয়,-
দেখলাম অবাক চোখে,--অপলক নয়নে মনোযোগ হেনে
সহজে সরাসরি যতখানি যেতে পারি,
-কাছে গিয়ে দেখলাম,-
-মুক্তমনার যেকোনো প্রত্যাশিত ভাবনা
সবখানে ছড়িয়ে গিয়ে,-
তার নিজের কাছেই ফিরে আসে প্রতিফলিত হ’য়ে ;
-কখনো অনুরূপ প্রতিফলন, অর্থাৎ,--যা’ ভেবেছে সে,
--তা-ই আসে ফলাফলে ;
--কোথাও বা প্রতিরূপে,-অর্থাৎ তার ভাবিত ভাবনার
বিপরীত দিয়ে মেলে।
এবং মুক্তমনাদের হিসেবের নিরীক্ষিত ভাবনা
হারিয়ে যায় না ; -কখনো তলিয়ে যায় না
বহুসংখ্যক অসম্ভব সম্ভাবনার জটলায় ;
মুক্তমনাকে দেখিনি কখনো ভুগতে গরমিলের হতাশায়।
ভাবনার এপিঠে ওপিঠে দুই সমতলে মুক্তমন সমান তালে ছোটে ;
স্বাধীন মুক্তমন সবদিকে সমান সচল,
-একধারে মেলে না যখন অন্যধারে ঠিকই মিলে যায়
মুক্তমনার ভাবনার সমীকরণের সঠিক ফলাফল।
-বাস্তবতায়,-‘ক্ষুদ্রতম থেকে বৃহত্তম
সবকিছুই পরিকল্পনার আওতায় ;
কোনোকিছুই যুক্তিহীন নয়,’- কঠিন স্থির এই সত্য ভাবনা
সোজাসুজি বুঝতে পারে ব’লেই সে সচল মুক্তমনা ॥
মুক্তমনা নিজে নিজে সহজে বুঝে নিতে পারে যে,--
--যা’ চেয়ে চেয়ে যায়নি পাওয়া,
তা’ ছিলো অজ্ঞানে অবাস্তব চাওয়া ॥
[আগ্রহীদের গ্রহণ করার উপযোগী সাধারণ সার্বজনীন তথ্য]
(সচেতন-মুক্ত-প্রসারিত মনের বিচরণ-ক্ষেত্র এতই বিশাল যে,
-যখন তখন অন্যের মনে উঁকি দিতে পারে ;
-যদি চায়, -কখনো কখনো একবারে ভিতরে ঢুকে গিয়ে
অন্যের কল্পনা এবং কৌশল চুরি ক’রে আনতেও পারে।)
মুক্তমনারা নামমাত্র-আভাসেই বুঝে নিতে পারে
অচেনা অজানা অন্যেরও মনের ভাবনা।
অথচ অথর্ব আমি, সংকীর্ণ, নিচ, আত্মমুখী, লোলুপ বন্ধ্যামনা
--নিজের মনটাকেই ঠিকমতো চিনতে পারি না।
-সংকুচিত আমার এ ‘মন’, --আবদ্ধ চক্রে ঘোরে সর্বক্ষণ ॥
-এলোমেলো জিজ্ঞাসাগুলো আমাকে ঘিরেই ঘোরে বন্-বন্ ;
অথবা ঐ জিজ্ঞাসাগুলোকে কেন্দ্র ক’রেই ঘোরে আমার মন।
জানা গ্যালো,-‘জবাবগুলোতেই আছে আমার পরিচয়,’-
-এতটুকু জানলেই নাকি যথেষ্ট জানা হয় ;
এবং আবোল তাবোল জিজ্ঞাসাগুলো আছে যতক্ষণ,-
-ততক্ষণ-ই নাকি অস্তিত্বশীল আমার এ ক্ষুদ্র মন ॥
যতক্ষণ আমি হচ্ছি না মুক্তমনা,
-ইচ্ছা জাগে মুক্তমনার মতো যদি ভাবতে পারতাম
অথবা আমাকে ভাবানো হ’তো ‘গোলে মেলে’-ধরণের
একটা গোলমেলে প্রশ্ন বা উত্তর নিয়ে, --যেমন,--
‘সকলে কি সচেতনভাবে, সত্যিকারভাবে, সকলের জন্য,--
যার যার অবস্থান সাপেক্ষে সর্বোচ্চ সুন্দরকে চায় !?’
উদ্ভট উলঙ্গ বিদ্ঘুটে প্রশ্নটা সরাসরি সাক্ষাতে জবাব চায় ;--
--সমমনাদের দায়িত্বপূর্ণ সমাবেশে
জবাব খোঁজে সরাসরি উত্তম পুরুষে ;
--‘ভালো থাকবার উপযোগী সুন্দর পারিবেশ’-এর দাবিদারদের
মুক্তসভায় অথবা মঙ্গল আকাঙ্ক্ষীদের গোপনীয় ঘরোয়া আড্ডায়
সাধারণ জিজ্ঞাসাটা এলো জবাব পাবার আশায় ॥
নিজেকে যথারীতি প্রদর্শন করবার সুযোগ পেয়ে যাই --
--‘অন্য সকলের মনের খবর রাখিনি,
-তবে আমি অবশ্যই চাই,’ -এ ধরণের জবাব
সত্যনিষ্ট সুবিবেচক মুক্তমনার-ই উপযুক্ত ;
-তাই, মুক্তমনার অনুকরণে জবাব দিয়ে
বন্ধ্যামনা আমিও বাহবা লুটতে চাই ॥
এবং এমনভাবে লোক-দেখানো, মূর্খ-ঠকানো,
চাতুরীপূর্ণ বুলি আওড়াতে থাকি,--ভাবখানা যেন
রক্ষণশীল আবদ্ধমনা সংকীর্ণমনা আমিও উদার !
এবং মুক্তমনার মতোই,-প্রত্যেকের যোগ্যতা অনুযায়ী
প্রত্যেকের জন্য সর্বোচ্চ সুন্দরকে চাই ! -বোঝাতে চাই।
‘আসলে কি উত্তম পুরুষে আমি বা আমরা সত্যিকার অর্থে তা’ চাই !?’
(বাহুল্য প্রশ্নের সত্য জবাব সর্বদাই প্রত্যেকের নিজের অন্তরে ঘূর্ণায়মান)
যারা বলি,--‘হ্যাঁ, -সত্যিকারভাবে চাই,’-
-কতখানি সত্যবাদী তারা
যাচাই ক’রে দেখি যেন নিজেকে
একটা আত্মজিজ্ঞাসা দ্বারা,-
--‘আমার হুকুম মান্যকারী কোনো মজুরিভুক্ত কর্মী
নিজ-যোগ্যতার গুণে হুকুম দেবার স্তরে পৌঁছে গেলে
তার অধীনে অথবা তার কোনো যোগ্য সন্তানের অধীনে
আমাকে বা আমার সন্তানকে আমি মেনে নিতে পারি কি !?’
অন্যদের বেলায়,-‘মেনে নেওয়া উচিত,’ বলি কপট মুক্তমনে,--
--অথবা, --না-বুঝেই সকলেই বলি নির্দ্বিধায়,
তবে, -সহজ (!) বিষয়টাই জটিল হ’য়ে যায় নিজের বেলায় ।
(সন্তুষ্টি নিয়ে হ্যাঁ-বোধক উত্তর দেবার মতো প্রশস্ত উদার মন
কেবল গুটিকতক মুক্তমনা সাধারণ মানুষের, --বিশাল অর্জন ॥)
খুব কম সংখ্যক মানুষ বিপাকে পড়ার আগে
বাস্তবতাকে মন থেকে সহজে মেনে নিতে পারি।
নিচু-মনারাই স্বভাবগতভাবে চাই না ছাড়তে যথাযোগ্যের আসন ;
-অযোগ্যরাই আধিপত্য আঁকড়ে ধরার চেষ্টা চালাই আমরণ ॥
সিংহভাগ মানুষই অবচেতনে
স্বভাব তাড়নার ক্রীতদাসত্বে জড়িত ;
-স্বনির্বাচিত মাতব্বরির বাতিক নিয়ে নিরাশাগ্রস্ত আত্মপ্রতারিত ॥
‘-(!)-তাহলে কি মুক্তমনা গুটিকতক মানুষ ছাড়া, -বাদ বাকি
সকলেই! -অন্যের উপর হুকুম চালানোর নেশায় নেশাগ্রস্ত !?
এবং যোগ্যতা থাকুক বা না-থাকুক, -অন্যেরা মানুক বা না-মানুক,-
শুধুই কি লুচ্চা-বেহায়া-নুছড়ার মতো, -স্বৈরাচারের সিংহাসন চাই !
অথবা স্বেচ্ছাচারের কোন্দল চাই !?’ -এ ধরনের প্রশ্ন নিশ্চয়ই
অন্যকে ছোড়া উচিত নয়, -যেখানে বা যখন
আমি নিজেই মুক্তমনা নই ॥
-তাছাড়া, সহজাত প্রবৃত্তির চাপে
অশ্লীল বাহুল্য জিজ্ঞাসা ছুড়ে ছুড়ে বেরোলে
সঙ্গী সহযাত্রী অথবা সহজীবীরা, -নির্ঘাত, -চ’লে যাবে আড়ালে ॥
মুক্তমনারা মনোযোগ দিয়ে যেকোনো জিজ্ঞাসা শোনে
আর হাসে মুক্তমনে ॥
-‘ময়নাতদন্ত করো নিজের মনের,’-বলে মুক্তমনা,
‘-তোমার যেখানে দৃঢ় অঙ্গীকার আছে মুক্তমনা হবার,
-আর কিছুরই নেই দরকার,-
নিয়ে যাও আশ্বাস, -স্থির প্রতিজ্ঞাধারীর নেই কিছু হতাশার-।
নিশ্চয়ই পেয়ে যাবে সত্য জবাব একখানা--
বাহুল্য জিজ্ঞাসাগুলো আর দেবে না যন্ত্রণা।’ -অভয় দেয় মুক্তমনা ॥
অতএব, নিজেকে দেখার চেষ্টা চালালাম আনাড়ির মতো।
যতদূর সম্ভব অনাবৃত হ’য়ে দেখলাম নিজেকে,
-অথবা আমাকে উলঙ্গ ক’রে দেখানো হ’লো জাগতিক চোখে।
--যদিও মেপে দেখিনি,-কতখানি ভুল,-নির্ভুল কতখানি,
তবে মনে হ’লো বুঝলাম,-এতটুকু বুঝলাম যে,-যখন আমি
জাগতিক কিছুই চাই না, -কোনো আনন্দ-বিলাশ-যশ-খ্যাতি চাই না,
চাই না তো,-কোনো কিছুই চাই না,-
ধন-মান-জন কিছুই চাই না,--
পক্ষ-বিপক্ষ কোনো পথ, কোনো মত, কোনো দল চাই না,-
অর্থাৎ, -সৃষ্ট জগতে এই ‘আমি’র চাওয়ার মতো কিছুই থাকে না ;
--মৃত নই, -তবু যেন নই জীবন্ত, -এ-যেন আত্মসম্মোহিত !-
-আশা-নিরাশা-হতাশা মিলে মিশে নিশ্চিহ্ন, -যেন শূন্যে বিলীন,-
--বৈরাগ্যে শান্তিপ্রাপ্ত এই আমি চলি ফিরি দায়-দায়িত্বহীন ॥
সর্বক্ষেত্রে ‘না-চাওয়া’-টাই যখন চাওয়া হ’য়ে যায় ;
--বস্তুজগতে ছুটতে হয় না কিছু পাবার নেশায়।
-বৈরাগ্য দেখে যারা উন্মাদ মনে করে আমাকে ;
-তাদেরকেই শূন্যের পেছনে ছুটন্ত উন্মাদ মনে হ’তে থাকে ;
--স্বজন শুভাকাক্সক্ষীর শুভকামনা চাঙ্গা হ’য়ে ওঠে।
--আমার বৈরাগ্য ঠেকানোর চেষ্টায় তারা পেছনে পেছনে ছোটে ॥
কেহই যখন উন্মাদ নই, -তখনো দেখলাম নিজেকে ;
-যে-দেখা নয় জাগতিক উপলব্ধিতে,
কিম্বা যে-দেখা নয় দৃশ্যমান দেহগত চোখের দেখায়,-
-বরং, -আত্ম-নিরপেক্ষ আশাবাদীদের ভাববাচ্যে দেখা বলা যায়।
অর্থাৎ দেখলাম বলার চেয়ে দেখানো হ’লো বলাই শোভনীয়
--যা’ আমাকে দেখানো হ’লো, -তা’ যথার্থই লোভনীয় (!)-॥
এবারে ‘না-চাওয়া’ থেকে টেনে এনে
মুক্তমনে চাওয়ার স্তরে ছেড়ে দিয়ে,
-মেলে ধরা বাস্তবতায় অতি সাধারণ মানুষের সাজে সাজিয়ে,
--‘সমাজের একজন সভ্য আমি’-কে
দেখানো হ’লো আমাকেই দর্শক বানিয়ে,
--যেখানে ভাবনায় দৃশ্যমান হ’লো,
-জগতে বর্তমান আমি অস্তিত্ব নিয়ে ॥
-এবারে যখন সবকিছু চাই, -অতুলনীয় অনন্য সমগ্রকে চাই,-
অর্থাৎ অ-খণ্ডিত অবস্থায় সবকিছু চাই ;--
-যেখানে সাধারণ শর্ত একটাই,--
-‘সমষ্টির ভগ্নাংশ বিশেষ কোনো দল চাই না,’-আমি সাধারণ তাই
সাধারণ সাজে সজ্জিত আমি,-সবকিছু চাই,
-দলে দলে কোন্দল এড়িয়ে সবকিছু চাই।
আমি চূড়ান্ত স্বার্থপর, -চাই তো চাই,
-কিছু বাদ না-দিয়ে সবকিছু চাই ;
--নাগালের ভেতরেই সবকিছু চাই,-
-একবারে নিজের জন্য চাই ॥
-নিজের প্রশান্তির জন্য যখন সবকিছু চাই,-
মহাসৃষ্টিতে দৃশ্যমান-অদৃশ্যমান, ভাঙ্গন-গড়ন-স্থিতি,
যশ, মান, সম্পদ, খ্যাতি, অখ্যাতি, কুখ্যাতি,-
ভাল-মন্দ সবকিছুতেই পরম আনন্দকে খুঁজে পেতে চাই।
যাবতীয় তথ্য, তত্ত্ব, ইঙ্গিত, ইশারা, -সবকিছুই,--
সাধ্যমতো ধারণ করতে চাই, -অবিকৃতভাবে যেমন আছে,
অবিচ্ছিন্নভাবে অব্যাখ্যাতভাবে যেমন আছে,-
--ঠিক তেমনিভাবে গ্রহণ করতে এবং গৃহীত হ’তে চাই; -
কোনো যুক্তি-তর্ক বা দ্বন্দ্বের ধার না-ধেরে, -আপন মনে চাই,
অথবা এই ক্ষুদ্র স্বতন্ত্র আমাকেও চাওয়ায় মুক্তমন, -
সেই স্থির প্রতিজ্ঞার বিনিময়ে চাওয়ায় মুক্তমন, -
--চাওয়ামাত্রই আমি পেয়ে যাই, -
--কানায় কানায় ভরপুর হ’য়ে যাই চাওয়ার সাথে সাথে।
তবুও অফুরন্ত চাওয়া চাইতেই থাকি এবং উছলাতে উছলাতে-
পূর্ণ ‘আমি’-র চাওয়া নিজের বাহিরে, -সবখানে ছড়িয়ে যায় ;
-এ যেন সকলের ‘সম্মিলিত স্থির চাওয়া’ গতিশীল আমাকেই চাওয়ায়।
এবং তখনি, -সত্যিকার মুক্তমনার মতোই, -পাই চাইবার দায়িত্বভার ;
--চূড়ান্তকে চাই নিজের জন্য এবং অন্য সকলের জন্য, -আর,
-সেই মহাক্ষণে, --আত্মপ্রতারণা করবার অক্ষমতার সেই সুভক্ষণে !--
-আমার অবস্থান হয় আত্মনিরপেক্ষতায়, -সচেতন শূন্যে, -
-এবং তীব্র আশাবাদী আমাতে ভাবাচরণ ঘ’টে যায় যত, -
-নিমেষে সেগুলো ছড়িয়ে যায় মহাবিশ্বময়, -মুক্তমনার মতো !
হতে থাকে প্রতিধ্বনিত, প্রতিবিম্বিত, -ফিরে আসে সাথে সাথে ;
--বিপরীত, অবিপরীত এবং মিশ্রভাবে বিভিন্ন অনুপাতে;
--শব্দ এবং আলো আলাদা আলাদাভাবে অথবা যৌথভাবে, -
অভ্রান্ত শ্রবণে, দর্শনে, -ফিরে ফিরে আসে; --
--শান্তিময় সুর আর বৈচিত্র্যময় সুন্দর বর্ণালী নিয়ে সম্মুখে ভাসে।
ভাবনার বিনিময়ে বাস্তবতাকে পেয়ে যাই, -যা’ নিখুঁত ছন্দময়, --
কখনো বা কোথাও চাতুরীর পার্শ্বচাপে ধাঁধাময় ধোঁয়ার মতো মনে হয় ॥
--‘মনের উপর থেকে প্রতারণার প্রলেপটুকু যদি স’রে যায়,-
থাকবে না কিছু ধোঁয়াটে বা ধাঁধাময়, -
আবরণটুকু ধুয়ে মুছে গেলে স্বচ্ছ-সহজ হ’য়ে যাবে
যা’ ছিলো অস্পষ্ট,-এলোমেলো ভাবনার জটলায়,’ -
-সহকর্মী সহযোগী মুক্তমনে অভয় দেয়,-নিজেও চেষ্টা চালায় ;
--আশ্বাস দেয় এবং আমাকে চেষ্টা চালিয়ে যেতে বলে।
কর্মজীবী মুক্তমনার দেওয়া আশ্বাসকে কখনো যেতে দেখিনি বিফলে ॥
পরাবাস্তবের ‘আমি’-র শৃঙ্খলে বাস্তবের ‘আমি’ শৃঙ্খলিত সজ্ঞানে ॥
--তা-ই বাস্তবে,--
‘কিছুই চাই না’ এবং ‘সবকিছুই চাই’-এর মাঝামাঝি অবস্থানে
মূলতঃ আমার একান্ত নিজের কিছুই করার নেই
-কেবল লক্ষ্যস্থির ক’রে মহানন্দে চেষ্টিত থাকা ছাড়া;
-কেবল ধৈর্য ধ’রে চেষ্টিত থেকে অপেক্ষা করা ছাড়া,
-এবং সচল মুক্তমনাদের সঙ্গে নিজেকে কর্মে-ভাবনায়
মিলিয়ে নেবার চেষ্টায় বারে বারে চেষ্টিত থাকা ছাড়া
কিছুই যেন করার নেই আমার এই জগৎ সংসারে ॥
সত্যবাদী আমি, -স্বীকার করছি, --আমি সংকীর্ণমনা।
তথাপি নিরাশ হ’তে পারি না, -আমার আছে সান্ত্বনা,
--সম্মুখে যাকেই দেখি, --চেনা বা অচেনা,--
মেনে নিয়েই আনন্দ পাই যে, সে আমার চে’ প্রশস্ত মুক্তমনা।
-আশ্বাস পাই, -পরিবেশ কখনোই নয় প্রতিকূল
মন্দ যা-কিছু দেখি, -তা’ আমার চোখের ভুল ॥
আমারি মনের ভেতরে নোংরা জটিলতা, -তাই,
-বাহিরের বিশ্বটাকে কুটিল হিসেবে দেখতে পাই ॥
আমার চাওয়া সবার জন্য হয় না, -
অথবা সার্বজনীন সুন্দরকে চাইতেই জানি না।
আমার চাওয়া হয় না অন্য সবার মতো বাস্তব সম্মত;
সবার সাথে খোলা-মনে চাইতেই জানি না মুক্তমনার মতো,-
তাইতো বিশালকে চেয়ে পাচ্ছি না,
-ক্ষুদ্র আমি, -আত্ম-প্রবঞ্চিত; -
চেয়েও না-পাওয়ার এটাই কারণ,
-এটাই ধ্রুব, -এটাই সুনিশ্চিত ॥
‘মুক্তমন’ আমাকে নিয়ে খেলছে না-কি করছে ছলনা, -বোঝা গ্যালো না।
এখানেই মনের ময়না তদন্তের শেষ, -না-কি শুরু হ’লো, -
-কী যে হ’লো, --বোঝা গেল না, ---বোঝা গ্যালো না--॥
--১২/০৬/২০০১ খ্রি:
http://www.somewhereinblog.net/blog/Koronik239happy/29022800
রবিবার, ১১ অক্টোবর, ২০০৯
এতে সদস্যতা:
পোস্টগুলি (Atom)